নিজস্ব প্রতিবেদন : চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের ঘটনাকে পুঁজি করে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলাগুলোতে ভয়ংকর সব অসঙ্গতি ও জালিয়াতির তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক আক্রোশ চরিতার্থ করা, নিরীহ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করা এবং ব্যক্তিগত বা জমি-সংক্রান্ত শত্রুতা উদ্ধারের উদ্দেশ্যে এক শ্রেণির সুবিধাবাদী চক্র সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ভুয়া মামলার জাল বুনেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানায় মোট ৭০৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩টি মামলাকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ এবং বাকি ১৬টিতে তথ্যগত অসঙ্গতি, ভুল পরিচয় ও ভুয়া কাগজপত্রের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
প্রবাসে ঘাম ঝরাচ্ছেন ‘শহীদ’, মৃত্যুসনদটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া! রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি হত্যা মামলার তদন্তে নেমে পুলিশের চোখ কপালে ওঠার দশা। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে ৪৬ বছর বয়সী ‘মো. বাবু’ নিহত হয়েছেন। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আসামি করা হয়। কিন্তু হাতিরঝিল থানা পুলিশের গভীর অনুসদ্ধানে জানা যায়, ‘বাবু’ নামের কোনো ব্যক্তি আদতে মারাই যাননি। তার প্রকৃত নাম মো. শাকিল এবং তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে দিনমজুর হিসেবে কর্মরত। সৌদি আরব থেকে হোয়াটসঅ্যাপে এক অডিও বার্তায় আকাশ থেকে পড়ার মতো শোনান শাকিল, “আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব আসলাম কীভাবে? আমি প্রবাসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছি, পুলিশও আমার সাথে কথা বলেছে।” তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলাম জানান, মামলার সাথে সংযুক্ত মৃত্যুসনদটি ছিল সম্পূর্ণ জাল। এমনকি মামলার তথাকথিত বাদী ইসমাইলও আদালতে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন যে, তার নাম-পরিচয় চুরি করে অন্য কেউ এই জালিয়াতি করেছে।
অতীতে পড়ে যাওয়ার দাগকে ‘বুলেটের ক্ষত’ বানানোর নাটক! জালিয়াতির আরেকটি নিকৃষ্টতম উদাহরণ তৈরি হয়েছে পল্টন থানায়। সেখানে ইয়াসিন আরাফাত নামের এক ব্যক্তি নিজেকে গুলিবিদ্ধ এবং ‘পারভেজ আলী’ নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন দাবি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসসহ একঝাঁক নেতার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। তদন্তভার পাওয়ার পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI) মাঠে নেমে দেখে, পারভেজ আলী নামের কথিত সেই নিহতের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। আর বাদী ইয়াসিন আরাফাতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবিটি ছিল এক চরম মিথ্যাচার। তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই মো. মাসুদ রানা জানান, “তদন্তে দেখা গেছে, কোনো একসময় তার পায়ে আঁচড় লেগে বা পড়ে গিয়ে কাটা-ছেঁড়ার যে দাগ হয়েছিল, সেটিকেই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘বুলেটের আঘাত’ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন। এর সপক্ষে কোনো মেডিকেল সনদও তিনি দেখাতে পারেননি।” স্থানীয়দের মতে, এই মামলার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ব্যক্তিগত ফায়দা ও মামলা বাণিজ্য।
পারিবারিক শত্রুতার জেরে আসামি পাবনার নিরীহ ট্রাকচালক পল্টন থানার ওই সাজানো মামলায় আসামি করা হয়েছে পাবনার দুই নিরীহ ট্রাকচালক আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা। আসামিদের মোবাইল কল রেকর্ড (CDR) বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, ঘটনার দিন তারা ঢাকা থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে পাবনাতেই অবস্থান করছিলেন। ভুক্তভোগী আব্দুল মতিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বাবার জন্মেও এই বাদী বা যে মারা গেছে বলে বলা হচ্ছে, তাদের নাম শুনিনি ভাই। পাশের বাড়ির কাশেম মুন্সির সঙ্গে আমাদের জমিজমা নিয়ে বিরোধ আছে। তার ভাতিজা রনি ঢাকায় ক্যামেরাম্যানের চাকরি করে এবং সে বাদীর বন্ধু। তারাই মিলে আমাদের হয়রানি করতে এই মামলায় নাম ঢুকিয়েছে।”
আদাবরে বাদীই ‘লাপাত্তা’ একইভাবে আদাবর থানায় তোহা খান নামের এক ব্যক্তির দায়ের করা মামলাটিকেও তদন্ত শেষে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ১৯ জুলাই আলীবর থানা এলাকায় আলী মিয়া নামে এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। কিন্তু তদন্তে আলী মিয়ার কোনো অস্তিত্ব মেলেনি, এমনকি এজাহারে দেওয়া বাদীর ঠিকানায় তোহা খান নামের কাউকেই খুঁজে পায়নি পুলিশ।
আইনবিদদের উদ্বেগ: ভাঙছে বিচার ব্যবস্থার মেরুদণ্ড অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক যৌক্তিকতাকে কালিমালিপ্ত করে এমন ‘ভুয়া মামলার রাজনীতি’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের আইন বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী একটি গুরুতর ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ভুয়া মামলাগুলো প্রমাণ করে যে শুরু থেকেই একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ঢালাই অভিযোগ করা হয়েছিল, যা বিচারকদের মানসিকতায় সামগ্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, মামলার ভুয়া বাদীদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। দেশের সচেতন মহলের দাবি, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষার্থে অবিলম্বে এসব কাল্পনিক ও ভুয়া মামলা বাণিজ্যের হোতাদের গ্রেফতার করা হোক এবং বিচারিক হয়রানি বন্ধ করা হোক।
