চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল গভীরভাবে উদ্বেগজনক এমন দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটির মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই এক মাসেই দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, গ্রেফতার, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
এইচআরএসএসের তথ্যমতে, নভেম্বরে অন্তত ৯৬টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১২ জন নিহত ও ৮৭৪ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে ১১ জন বিএনপির এবং একজন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) নেতা-কর্মী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় দুজন নিহত হন এবং মনোনয়নসংক্রান্ত সংঘর্ষ, হামলা ও অগ্নিসংযোগে আহত হন আরও ২৬২ জন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে ৫২ জন, বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে ৪১ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের সংঘর্ষে ১৫৫ জন আহত হন। বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হন ১১৪ জন, নিহত হন দুজন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। নভেম্বরে ২০টি গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় ১৬ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে কারাগারে তিনজন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ও নয়জন হাজতির মৃত্যু হয়।
সাংবাদিক নির্যাতনের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। নভেম্বরে ২৩টি ঘটনায় ৩৬ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ২২ জন আহত, ১১ জন হুমকির মুখে পড়েন এবং একজনকে গ্রেফতার করা হয়। পাশাপাশি দুটি হয়রানিমূলক মামলায় দুজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ–২০২৫-এর আওতায় নভেম্বরে দায়ের হওয়া সাতটি মামলায় নয়জনকে গ্রেফতার এবং ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের গ্রেফতারের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় অন্তত ৩৮টি মামলায় ১ হাজার ১৬৬ জনের নাম উল্লেখ এবং ২ হাজার ৩০১ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৯৯৩ জন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ১ হাজার ৭১৪ জন এবং বিএনপির নেতাকর্মী ৩৬ জন। পাশাপাশি যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে সারা দেশে ছয় হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও ভয়াবহ। নভেম্বরে অন্তত ১৭৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ৪৮ জন, যাদের ২৫ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১৩ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় দুজনকে।
শ্রমিক নির্যাতনের ২৫টি ঘটনায় চারজন নিহত ও ৭৬ জন আহত হন। অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারান আরও ১৪ জন শ্রমিক।
সীমান্ত পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। নভেম্বরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তিনটি ঘটনায় বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি নিহত ও চারজন আহত হন। একই সময়ে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে আরাকান আর্মি চারটি ট্রলারসহ ২৬ জন বাংলাদেশি জেলেকে আটক করে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে। তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
